তাহাবী শরীফের বাংলা অনুবাদ: সহজেই ডাউনলোড করুন

শরহু মায়ানিল আছার বা তাহাবী শরীফ হানাফী মাযহাবের দলীল ভিত্তিক একটি হাদীস সংকলনগ্রন্থ। মানব জীবনের প্রয়োজনীয় আহকাম বিষয়ক হাদীসগুলো এ কিতাবে একত্রিত করা হয়েছে। গ্রন্থটি বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বিভক্ত। প্রতিটি অধ্যায়ে নাসিখ, মানসুখ, বিশেষজ্ঞ আলিম ও মনীষীদের ব্যাখ্যা - বিশ্লেষণসমূহ  সন্নিবেশিত। শরীয়াহর বিভিন্ন বিষয় সম্পকে ইমাম আবু জা’ফর তাহাবী র. (মৃতু সন : ৩২১ হিঃ) এর সুচিন্তিত মতামত এ কিতাবে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। 

ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত বাংলা অনুবাদগুলো এখনই ডাউনলোড করে নিন।
১ম খন্ড
 ↡
২য় খন্ড


ইমাম আবু জা’ফর তাহাবী (রহ:)-এর জীবনী
যে সকল মনীষীর যাদু কাঠির পরশে ফিক্হ শাস্ত্র উৎকর্ষের সোপান বেয়ে মর্যাদার শৈল চূড়ায় এবং উন্নতির গিরিশৃঙ্গে সমাসীন হয়েছে তাদের মধ্যে যুক্তিবাদী, সুপণ্ডিত ইমাম আবু ফা’ফর তাহাবী (রহ:) ছিলেন ফিক্হ শাস্ত্র গগনের দীপ্তরবি।

পরিচিতি: 
তাঁর নাম আহমদ, পিতার নাম মুহাম্মদ, উপনাম আবু জা’ফর, দাদার নাম সালামা, নিসবতী নাম তাহাবী, আযদী, মিসরী, হাজরী, হানাফী।

বংশ পরিচিতি:
তাহাবী শরীফে তাঁর বংশ পরিচয় নিম্নবর্ণিত পন্থায় উল্লেখ করা হয়েছে- 
ইমাম তাহাবী (রহ:) এর পূর্ণ নাম ইমাম হাফিয আবূ জা’ফর আহমদ ইবন মুহাম্মদ ইবন সালামা ইবন আবদুল মালিক ইবন সুলাইম ইবন খাব্বাব আযদী হাজারী মিসরী আত-তাহাবী আল-হানাফী।

জন্ম বৃত্তান্ত:
তিনি বর্তমান মিসরের ‘তাহা’ নামক প্রাচীন গ্রামে ২৩৮ হিজরীর ১২/১০ রবিউল আওয়াল রবিবার শুভ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্ব পুরুষগণ ইয়ামানের সুপ্রসিদ্ধ আয্দ এবং এর শাখা হাজার গোত্রভুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে মিসর বিজয়ের পর তারা মিসরে এসে বসবাস শুরুকরেন। যেহেতু তাঁর পূর্বপুরুষগণ ইয়ামানের আযদ ও হাজার গোত্রের অধিবাসী ছিলেন, এজন্য ইমাম তাহাবী (রহ:) কে আযদী ও হজারী বলা হয়। আর যেহেতু মিসরের ‘তাহা’ নামক প্রাচীন পল্লীতে তাঁর জন্ম এজন্য তাঁকে মিসরী ও তাহাবী বলা হয়।

শৈশব:
তাঁর শৈশবকাল ছিল অত্যন্ত পূতঃপবিত্র ও নির্মল। তিনি কখনো পাপাচার বা গর্হিত কাজের সাথে জড়িত ছিলেন না। শৈশবকাল হতেই শিক্ষার প্রতি তাঁর অসাধারণ অনুরাগ পরিলক্ষিত হয়।

শিক্ষালাভ: 
তাঁর শিক্ষা জীবনের সূচনা হয় তাঁর মামা আবু ইবরাহীম ইসমাঈল ইবনে ইয়াহিয়া মুযানী (রহ:) এর নিকট। মুযানী শাফেয়ী মাযহাবের একজন প্রখ্যাত আলেম ছিলেন। আল্লামামুযানী (রহ:) তখন মিশরে অবস্থান করতেন। ইমাম আবু জা’ফর তাহাবী (রহ:) জ্ঞান পিপাসা নিবৃত করার মানসে স্বীয় আবাসস্থল থেকে মিশরে আসেন।

তিনি জ্ঞান আহরণের মিমিত্তে অনেক জায়গা সফর করেন। যেখানেই কোন জ্ঞান তাপসের সন্ধান পেতেন সেখানে গিয়ে উপস্থিত হতেন এবং জ্ঞান পিপাসা নিবৃত করতেন। ২৬৮ হিজরিতে তিনি সিরিয়া ভ্রমণ করেন। তা ছাড়া বায়তুল মুকাদ্দাস, আসকালান ইত্যাদি স্থানে মনীষীদের থেকে হাদীস শ্রবণ করেন। দামেশকের আবু আযেম আব্দুল হামীদ থেকে ইলমে ফিকহের জ্ঞান লাভ করেন। বিভিন্ন দেশের মনীষীদের থেকে জ্ঞানার্জন করে ২৬৯ হিজরিতে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

শিক্ষকমন্ডলী:
তিনি অসংখ্য উস্তাদ থেকে ফিক্হ, তাফসীর, হাদীস, আরবী সাহিত্য, নাহু, সরফ, বালাগাত, মানতিক ইত্যাদি বিষয়ের জ্ঞান লাভ করেন। 
তাঁর প্রসিদ্ধ উস্তাদগণ হলেন-
০১। ইবরাহীম ইবনে আবু দাউদ বারলাছী, 
০২। ইবরাহীম ইবনে যানকাদ খাওলানী, 
০৩। ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মদ,
০৪। ইবরাহীম ইবনে মারযুক বসরী, 
০৫। আহমদ ইবনে কাসেম কূফী, 
০৬। আহমদ ইবনে দাউদ ছাদুছী,
০৭। আহমদ ইবনে সাহল রাযী, 
০৮। আহমদ ইবনে আছাম মুযানী, 
০৯। আহমদ ইবনে মাসউদ মাকদাসী, 
১০। আহমদ ইবনে সাঈদ ফাহরী, 
১১। আবু বশির আহমদ দুলাবী, 
১২। ইসহাক ইবনে ইবরাহীম, 
১৩। ইসহাক ইবনে হাসান, 
১৪। ইসমাঈল ইবনে ইয়াহিয়া মুযানী, 
১৫। বাহার ইবনে নসর খাওলানী, 
১৬। বাকার ইবনে কুতাইবা, 
১৭। মুহাম্মদ ইবনে সালামা তাহাবী প্রমুখ।

সহচর ও ছাত্রবৃন্দ
অগণিত জ্ঞান পিপাসু তাঁর নিকট হতে জ্ঞান আহরণে নিজেদেরকে ধন্য করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য ছাত্রগণ হলেন-
০১। আবু উসমান আহমদ ইবনে ইবরাহীম,
০২। আহমদ ইবনে আবদুল ওয়ারেস যুজাজ, 
০৩। আহমদ ইবনে মুহাম্মদ দামেগানী, 
০৪। আবু মুহাম্মদ হাসান ইবনে কাসেম, 
০৫। সুয়ালমান ইবনে আহমদ তিবরানী, 
০৬। আবু মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ ইবনে হাদীদ,
০৭। আবদুর রহমান ইবনে ইসহাক জাওহারী, 
০৮। আবুল কাসেম উবায়দুল্লাহ ইবনে আলী দাউদী প্রমুখ।

মাযহাব:
ইমাম আবু জা’ফর তাহাবী (রহ:) জীবনের ক্রমোন্নতির সূচনাতে স্বীয় মামা আবু ইবরাহীম মুযানী শাফেয়ী (রহ:)-এর কাছে ইলমে ফিক্হ শিক্ষা আরম্ভ করেন। প্রথমত তিনি ইমাম মুযানী (রহ:) থেকে শিক্ষা লাভ করে তাঁরই মাযহাব ‘শাফিঈ মাযহাব’ গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। তারপর বোধ শক্তি যত বাড়তে থাকে ইনকিলাব-এর দ্বার তত উন্মুক্ত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তিনি শাফেয়ী মাযহাব ত্যাগ করে হানাফী মাযহাবের অনুসারী হন। যখন ইমাম আহমদ ইবন আবী আমরান হানাফী (রহ:) মিসরের কাজী (বিচারক) হিসেবে আগমন করেন তখন তিনি মামার দরস ও মাযহাব পুরত্যাগ করে ইমাম আহমদ ইবন আবী ইমরান হানাফী (রহ:)Ñএর দরস ও মাযহাব গ্রহণ করেন।


১২ ই রবিউল আউয়াল: শোক নয় আনন্দ প্রকাশের মাস



প্রশ্ন করা হয়ে থাকে যে, ১২ ই রবিউল আউয়াল তথা এ মাস হলো আল্লাহর রাসুল (দ.) এর জন্মের মাস এবং ওফাতের মাসও। তো মিলাদুন্নবী তথা খুশি প্রকাশের সাথে সাথে শোক কেন প্রকাশ করা হয় না?

    জবাব - এই প্রশ্নের জবাবে ইমাম হাফেজ জালালুদ্দিন সুয়ুতী (র.) الحاوى للفتاوى  (১ম খন্ড/ পৃঃ২২৬কিতাবে বলেন :
'নিশ্চয়ই নবী করিম (দ.) এর জন্ম বা মিলাদ আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় নেয়ামত এবং তাঁর ওফাত আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় মুসিবত। আর ইসলামী শরীয়ত নেয়ামত লাভের জন্য শুকরিয়া আদায়ের প্রতি বেশী গুরুত্ব দিয়েছে এবং বিপদে ধৈর্যধারণ, স্থির থাকা ও তা গোপন রাখার প্রতি উৎসাহ দিয়েছে। শরীয়ত নবজাত শিশুর জন্য খুশি ও শুকরের নিমিত্তে আকীকা করার নির্দেশ দিয়েছে, কিন্তু; মৃতের জন্য পশু যবেহ করার নির্দেশ দেয়নি। বরং মৃতের জন্য বিলাপ ও দুঃখ প্রকাশ করতে নিষেধ করেছে। সুতরাং ইসলামী শরীয়তের বিধান এ মর্মে দালালত করে যে, রাসুলুল্লাহ (দ.) এর মিলাদ উপলক্ষ্যে এ মাসে আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করা উত্তম, ওফাতের জন্য দুঃখ প্রকাশ নয়।'

    ☆আল্লামা ইবনে রযব হাম্বলী (র.) বলেন : 'নবী (দ.) এর ভালোবাসা হলো ঈমানের অংশ এবং আল্লাহর ভালোবাসার সংযোগ। আল্লাহ এর দ্বারা রহমত বর্ষন করেন এবং যারা আল্লাহ ও তার রাসুলে ভালোবাসার ওপর আত্মীয় স্বজন, ধন-সম্পদ, দেশসহ অন্যান জিনিসের ভালোবাসা প্রাধান্য দিবে আল্লাহর তাদেরকে কঠোর শাস্তি দিবেন।' মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন : –বলুন, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান-যাকে তোমরা পছন্দ কর- আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর রাহে জেহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত| আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না|
   একবার হযরত ওমর (রা.) রাসুল (দ.) কে বললেন : হে আল্লাহর রাসুল, নিশ্চয়ই আপনি আমার কাছে আমার নিজ সত্তা ছাড়া পৃথিবীর সব কিছুর চেয়ে বেশি প্রিয়।' তখন রাসুল (সা.) বললেন, ıকোনো ব্যক্তির কাছে যতক্ষণ আমি তার নিজ সত্তা অপেক্ষা বেশি প্রিয় না হব, ততক্ষণ পর্যন্ত সে মুমিন হতে পারবে না।IJ অতঃপর ওমর বললেন, 'আল্লাহর কসম! এখন আপনি আমার কাছে নিজ সত্তা অপেক্ষা বেশি প্রিয়।' তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ıহে ওমর, এখন তুমি (মুমিন হলে)|
সুতরাং আল্লাহর রাসুল (দ.) এর প্রতি ভালোবাসাকে আবশ্যকীয়ভাবে ব্যক্তিসত্ত্বা, আত্মীয়-স্বজন, সন্তান - সন্তুতি, পরিবার - পরিজন, ধন - সম্পদসহ আরো যাবতীয় জিনিস যেগুলো ভালোবাসার যোগ্য তার ওপর প্রাধান্য দিতে হবে। অতএব, মিলাদুন্নবী উদযাপন করা তাঁর প্রতি ভালোবাসারই প্রকাশ। মিলাদুন্নবীর আনুষ্ঠানিকতা মূলত তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। আর তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ধর্মীয়ভাবেই আবশ্যকী বিষয়। কেননা, এটাই মূল স্তম্ভ এবং উত্তম অবলম্বন। আল্লাহ তায়ালা  তার নবীর মর্যাদা জানতেন এবং সমগ্র বিশ^কে তা জানিয়েছেন; তাঁর নাম, আগমণ, মর্যাদা এবং স্থানের মাধ্যমে। বিশ^জাহান সীমাহীন আনন্দে ও পরম আবেসে দুলছিল; নবী করিম (দ.) ছিলেন বিশে^র জন্য খুশি, নেয়ামত ও আল্লাহর হুজ্জত।
   ☆কবি আহমদ শাওক্কী বলেন :
"হেদায়াতের কান্ডারী নবীর জন্মে হল আলোকিত কায়েনাত : যুগ-যুগান্ত মুচকি হাসিয়া গাইল প্রশংসা গীত।
জিব্রিল আর বড় যত আছে ফেরেশতাকুল আসে তাঁর পাশে : দীন আর দুনিয়ার লাগি এল মহা শুভার্থী ।"

আরও পড়ুন:
ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উদযাপনের দলীল।


ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনের দলীল

মূল: ড. মোঃ সাইফুল ইসলাম
ভাষান্তরে: মোঃ হাবীবুর রহমান

সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর, যার দয়া ও করুণা অপার। অসংখ্য দরুদ ও সালাম সৃষ্টিরকুলের মুক্তিরদূত হযরত মুহাম্মদ (দ.) এর প্রতি। আরও সালাম তাঁর পূতপবিত্র আহলে বাইত, হেদায়াতের সিতারা সাহাবাগণের প্রতি। এ ধরায় মুহাম্মদ (দ.) এর আগমন সমগ্র সৃষ্টির জন্য ঐশ্বরিক রহমতের অভিব্যক্তি ছিল। তাই তাঁর আগমনের দিন ১২-ই রবিউল আউয়াল সোমবার উপলক্ষ্যে 'মীলাদুন্নবী উদযাপন মূলতঃ মানুষদের সমবেত করা, কুরআনের অংশ-বিশেষ তিলাওয়াত, মহানবী (দ.) এর ধরাধামে শুভাগমন সংক্রান্ত ঘটনা ও লক্ষ্মণগুলোর বর্ণনা পেশ, অতঃপর তবাররুক (খাবার) বিতরণ এবং সবশেষে সমাবেশ ত্যাগ, তা উত্তম বেদআত (উদ্ভাবন); আর যে ব্যক্তি এর অনুশীলন করেন তিনি সওয়াব অর্জন করেন, কেননা এতে জড়িত রয়েছে রাসূলুল্লাহ (দ.) এর মহান র্মযাদার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রর্দশন এবং তাঁর সম্মানিত বেলাদাতের প্রতি খুশি প্রকাশ।'
রাসুল (দ.) এর প্রতি ভালোবাসারই বহিপ্রকাশ এবং আল্লাহ পবিত্র কোরআনে তাকে ভালোবাসা আমাদের ওপর আবশ্যক করে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন:

 .النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِم

নবী মু’মিনদের নিকট তাদের নিজেদের চেয়ে অধিক ঘনিষ্ঠ।   (সুরা আহযাব : ০৬) 
হাদীস শরীফও ইহার সত্যায়ন করেছে যে, আল্লাহর নবীর ভালোবাসা ঈমানের জন্য আবশ্যক। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হিশাম র. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: একবার হযরত ওমর (রা.) রাসুল (দ.) কে বললেন : 'হে আল্লাহর রাসুল, নিশ্চয়ই আপনি আমার কাছে আমার নিজ সত্তা ছাড়া পৃথিবীর সব কিছুর চেয়ে বেশী প্রিয়।' তখন রাসুল (সা.) বললেন, কোনো ব্যক্তির কাছে যতক্ষণ আমি তার নিজ সত্তা অপেক্ষা বেশী প্রিয় না হব, ততক্ষণ র্পযন্ত সে মুমনি হতে পারবে না। অতঃপর ওমর বললনে, 'আল্লাহর কসম! এখন আপনি আমার কাছে নিজ সত্তা অপেক্ষা বেশী প্রিয়।' তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে ওমর, এখন তুমি (মুমিন হলে)।  অতএব, মিলাদুন্নবীর আনুষ্ঠানিকতা মূলত তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। আর তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ধর্মীয়ভাবেই আবশ্যকী বিষয়। কেননা, এটাই মূল স্তম্ভ এবং উত্তম অবলম্বন।

    ☆সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ঈদে মিলাদুন্নবী উদাযাপনকারী সম্পর্কে আল্লামা ইবনে কাছীর (র.) البداية والنهاية  নামক ইতিহাসের কিতাবে বলেন: মালেক মুজাফ্ফর আবু সাঈদ বিন জয়নুদ্দিন (আরবলের বাদশাহ)। তিনি প্রতি বছর রবিউল আউয়াল মাসে স্বীয় শহরে জৌলুসর্পূণভাবে বিরাট মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করতেন। তথায় বহু সুফী, আলেম ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকতেন। তিনি একজন বেনজির বীর, আলেম, বিচারক ছিলেন। মিলাদুন্নবী সম্পর্কে সর্বপ্রথম কিতাব রচনা করেন ইবনে দাহিয়াহ (র.) যার নাম ছিল : التنوير بمولد البشير النذير এবং এর জন্য তাকে একহাজার দিনার উপঢৌকন দেওয়া হয়। (তাফসীরে রুহুল বায়ান, ইসমাঈল হাক্কী র., প্রকাশক : দারুল ফিকর; বইরুত, তাফসীরে সুরা ফাতহ, ৯ম খন্ড, পৃঃ ৫৬)

      কোরআনের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী:

    ☆আল্লাহ বলেন:
  .قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ

বল, আল্লাহর দয়া ও মেহেরবাণীতে। সুতরাং এরই প্রতি তাদের সন্তুষ্ট থাকা উচিৎ। এটিই উত্তম সে সমুদয় থেকে যা সঞ্চয় করছ।(সুরা ইউনুস : ৫৮)  
আর নবী করিম (দ.) হলেন হেদায়াতের রহমত। যেমন নস এসেছে :

  .وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ

আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্যে রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি। (সুরা ইউনুস : ৫৮)  
নবী করিম (দ.) এর জন্মদিন উদযাপন করা আনন্দ ও ভালোবাসারই প্রকাশমাত্র। সুতরা মিলাদুন্নবী উদযাপান করা আদিষ্ট গন্ডীর ভিতরেই রয়েছে এবং এটা সর্বোত্তম। আর আনন্দ ও খুশি প্রকাশের তরে আনুষ্ঠানিকতা, এটা সবার কাছে খুব প্রচলিতরীতিই। যেমনিভাবে বিবাহ, ওলিমা, আকিকাসহ অন্যান্য কাজের আনুষ্ঠানিক বিধান ত্যাগ বা গোপন করা যায়না। এ ছাড়া আরোও আয়াত রয়েছে যেগুলো মিলাদুন্নবী উদযাপনের বিধানকে সাব্যস্ত করে। যদি এ ব্যাপারে স্পষ্ট আয়াত নেই, তাতে কোন অসুবিধা নেই। কেননা, অসংখ্য ফিকহী মাসাআলা রয়েছে যার ব্যাপারে নসসে সরীহ নেই।  

      হাদীসে ঈদে মিলাদুন্নবী:

    ☆হযরত আবু কাতাদাহ (রা.) খেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : রাসুলুল্লাহ (দ.) কে সোমবার দিনে রোযা রাখার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন :

    فيه ولدت، وفيه أنزل علي 

এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছিলাম এবং এই দিনেই আমার ওপর অহী অবতীর্ণ হয়। (সহীহ মুসলিম  كتاب الصوم, ২য় খন্ড/ পৃষ্ঠা: ৮১৯। হাদীস নং ১১৬২)
দেখা যাচ্ছে যে, আল্লাহর রাসুল (দ.) নিজেই তার জন্মদিনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছেন। আর এ সম্মান প্রকাশিত হয়েছে রোযার দ্বারা। এ হাদীসে মিলাদুন্নবী উদযাপনকে কেবল রোযা রাখার দ্বারাই সীমাবদ্ধ করা হয়নি, বরং যাবতীয় ইবাদতের মাধ্যমেও তা উদযাপন করা যাবে।

    ☆হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন :

 .أن النبى صلى الله عليه وسلم عقَّ عن نفسه بعد النبوة

নবী করিম (দ.) নবুয়্যতের পর নিজের পক্ষ থেকে আকীকা করেছেন। (আবু বকর আল বায়হাকী র, السنن الكبري, প্রকাশক: দারুল কুতুবিল ইলমিয়া; লেবানন; বাইরুত, ২০০৩ সাল, كتاب الضحايا، ৯ম খন্ড/ পৃষ্ঠা : ৫০৫. হাদীস নং ১৯২৭৩।)

ইসলামি শরীয়ার প্রসিদ্ধ সুত্র হলো : "আকীকা দ্বিতীয়বার গণ্য করা হয় না।" অর্থাৎ আকীকা একবারই করা হয়। কেননা, ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী র. উক্ত হাদীস আনায়নের পর উল্লেখ করেন যে, নিশ্চয়ই নবী করিম (দ.) এর দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর জন্মের ৭ম দিনে আকীকা সম্পন্ন করেছিলেন। আর আকীকা দুইবার হয় না। সুতরাং এ থেকে বুঝা গেল যে, নবী করিম (দ.) কে বিশ^বাসীর জন্য রহমতস্বরুপ প্রেরণ এবং তাঁর উম্মতের জন্য রাসুল হিসেবে প্রেরণ করায় আল্লাহর শুকরজ্ঞাপনের নিমিত্তে তিনি নিজের জন্য এসব করেছেন।  (الحاوي للفتاوي, প্রকাশক : দারুল ফিকর; লেবানন; বইরুত, প্রকাশকাল: ২০০৪ সাল, ১ম খন্ড/ পৃ: ২৩০।)

 বিভ্রান্তির নিরসন :   

প্রশ্ন করা হয়ে থাকে যে, ১২ ই রবিউল আউয়াল তথা এ মাস হলো আল্লাহর রাসুল (দ.) এর জন্মের মাস এবং ওফাতের মাসও। তো মিলাদুন্নবী তথা খুশি প্রকাশের সাথে সাথে শোক কেন প্রকাশ করা হয় না?
    জবাব - এই প্রশ্নের জবাবে ইমাম হাফেজ সুয়ুতী (র.) الحاوى للفتاوى  (১ম খন্ড/ পৃঃ  ২২৬কিতাবে বলেন :

'নিশ্চয়ই নবী করিম (দ.) এর জন্ম বা মিলাদ আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় নেয়ামত এবং তাঁর ওফাত আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় মুসিবত। আর ইসলামী শরীয়ত নেয়ামত লাভের জন্য শুকরিয়া আদায়ের প্রতি বেশী গুরুত্ব দিয়েছে এবং বিপদে ধৈর্যধারণ, স্থির থাকা ও তা গোপন রাখরা প্রতি উৎসাহ দিয়েছে। শরীয়ত নবজাত শিশুর জন্য খুশি ও শুকরের নিমিত্তে আকীকা করার নির্দেশ দিয়েছে, কিন্তু; মৃতের জন্য পশু যবেহ করার নির্দেশ দেয়নি। বরং মৃতের জন্য বিলাপ ও দুঃখ প্রকাশ করতে নিষেধ করেছে। সুতরাং ইসলামী শরীয়তের বিধান এ মর্মে দালালত করে যে, রাসুলুল্লাহ (দ.) এর মিলাদ উপলক্ষ্যে এ মাসে আনন্দ ও খুশি প্রকাশ কার উত্তম, ওফাতের জন্য দুঃখ প্রকাশ নয়।'\